বেলাল হত্যার প্রধান সন্দেহভাজনের কারামুক্তিতে মীরেরহাট বাজারে আতঙ্ক

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৭ অপরাহ্ণ   |   ৫৫ বার পঠিত
বেলাল হত্যার প্রধান সন্দেহভাজনের কারামুক্তিতে মীরেরহাট বাজারে আতঙ্ক

সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি :

 

 

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মানসিক প্রতিবন্ধী বেলাল হোসেন (৩২) হত্যাকাণ্ডের কথিত প্রধান সন্দেহভাজন ও চিহ্নিত মাদক কারবারি গাজাটি সুমন কারাভোগ শেষে মুক্তি পাওয়ায় এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এতে নিহতের পরিবার, মীরেরহাট বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২০ জানুয়ারি মীরেরহাট বাজারে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর হাতে আটক হন গাজাটি সুমন। পরে স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়াবেন না—এমন মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

 

এর আগে গত ৮ নভেম্বর গভীর রাতে সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের মীরেরহাট বাজারে ঘুমন্ত অবস্থায় মানসিক প্রতিবন্ধী বেলাল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত বেলাল পূর্ব সৈয়দপুর গ্রামের মৃত আবুল কালাম ও মৃত গুরাধন বিবির ছেলে।

 

ঘটনাস্থলের বিবরণ

হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাজারের প্রবেশমুখে একটি সেমিপাকা উন্মুক্ত সেডের মেঝেতে বেলালের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে ছিল। কাঠের টুকরা দিয়ে মাথায় আঘাত করায় তার মাথা গুরুতরভাবে থেঁতলে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত কাঠের টুকরা ও এক জোড়া ব্যবহৃত স্যান্ডেল উদ্ধার করে।

 

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ধারণা করছে, গভীর রাতে পরিকল্পিতভাবেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

 

হত্যার কারণ নিয়ে স্থানীয়দের ধারণা

মীরেরহাট বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ জামশেদ আলম বলেন,
“বেলাল মানসিক প্রতিবন্ধী হলেও নিয়মিত রাতে বাজারে অবস্থান করত। এতে চোর, ডাকাত ও মাদক কারবারিদের অবৈধ কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি হতো। ধারণা করা হচ্ছে, এ কারণেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।”

 

তিনি জানান, ঘটনার রাতে মীরেরহাট বাজারে সিএনজি চালক সংগঠনের উদ্যোগে সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়, যা রাত আনুমানিক ১টার দিকে শেষ হয়।

 

সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

স্থানীয় সূত্র ও বাজার কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, গাজাটি সুমন একজন চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হত্যার হুমকি এবং চাঁদাবাজিতে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার মালিকানাধীন ‘শাকিল ট্রেডার্স’ দোকানে নেশাজাতীয় দ্রব্য মজুদ, সেবন ও বিক্রয়ের অভিযোগও রয়েছে।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলাল হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরবর্তীতে মাদক মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হয়। ওই মামলায় কারাভোগ শেষে মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা

মোহাম্মদ জামশেদ আলম অভিযোগ করে বলেন,
“বেলাল হত্যার পর যারা প্রতিবাদ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে গাজাটি সুমন একের পর এক মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেছে।”

 

এ বিষয়ে মামলা নং–৬৭/২০২৬ (তারিখ: ২৭ জানুয়ারি) এবং মামলা নং–২৯/২০২৬ (তারিখ: ১৩ জানুয়ারি) দায়েরের তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি আরও জানান, গাজাটি সুমন প্রকাশ্যে তার নাম ধরে হত্যার হুমকি দিচ্ছে এবং তার বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের হুমকিও দিয়েছে। এ ঘটনায় তিনি সীতাকুণ্ড মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন (জিডি নং–১১৫৩, তারিখ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬)।

 

পুলিশের বক্তব্য

বেলাল হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. রাসেল জানান, গাজাটি সুমন তার বিরুদ্ধেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ দাখিল করেছেন।

 

সীতাকুণ্ড মডেল থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন,
“প্রাথমিকভাবে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তদন্তের গতি আরও বাড়ানো হবে।”

 

ঘটনার পর এএসপি (সার্কেল) লাবিব আবদুল্লাহ ও ওসি মজিবুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

 

এলাকাবাসীর দাবি

কথিত আসামির প্রকাশ্যে চলাফেরা ও প্রভাব বিস্তারের কারণে মীরেরহাট বাজারের ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ এবং নিহতের পরিবার চরম আতঙ্কে রয়েছেন। তারা দ্রুত সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার, হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, সব ষড়যন্ত্র উন্মোচন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।