গণতন্ত্রের নতুন মহাকাব্য: বঙ্গভবন ছেড়ে সংসদ প্রাঙ্গণে শপথের প্রস্তুতি

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৫৪ অপরাহ্ণ   |   ৪৭ বার পঠিত
গণতন্ত্রের নতুন মহাকাব্য: বঙ্গভবন ছেড়ে সংসদ প্রাঙ্গণে শপথের প্রস্তুতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় ক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। ঐতিহ্যের দেয়াল ভেঙে এবং প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে আগামীর গণতান্ত্রিক সরকার। 

আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার কেবল একটি শপথ অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি নতুন যুগের সূচনার সাক্ষী হতে যাচ্ছে গোটা দেশ। প্রথমবারের মতো দেশের কোনো মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে উন্মুক্ত চত্বরে, জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীক জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

এই সিদ্ধান্তটি কেবল একটি স্থান পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বার্তা। দেড় বছরের দীর্ঘ অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অবসান ঘটিয়ে যখন একটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, তখন তারা গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুকেই বেছে নিয়েছে তাদের যাত্রার সূচনাস্থল হিসেবে।

রাজনৈতিক দলগুলো এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দিনটি হবে মূলত ‘শপথের দিন’।

আগামীকাল সকালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের শপথ কক্ষে এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। সংবিধান ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এই শপথ বাক্য পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। দীর্ঘ দেড় বছর পর সংসদ ভবন এলাকা ফের জনপ্রতিনিধিদের পদচারণায় মুখরিত হবে।

একই দিন বিকেল গড়াতেই শুরু হবে মূল আকর্ষণ। সংসদ ভবনের মনোরম দক্ষিণ প্লাজায় অস্থায়ী ও রাজকীয় প্যান্ডেল এবং মঞ্চ তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন, ১৭ তারিখের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য তাঁরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। সাধারণত বঙ্গভবনের দরবার হলে এই অনুষ্ঠান হলেও, এবার দক্ষিণ প্লাজাকে বেছে নেওয়া হয়েছে একটি ‘ওপেন ডেমোক্রেসি’ বা মুক্ত গণতন্ত্রের আবহ তৈরি করতে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ও প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে-

১. গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু: জাতীয় সংসদ হলো জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র। রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন সরকার তাদের যাত্রা শুরু করতে চায় জনগণের সবচেয়ে কাছাকাছি থেকে।

২. সংস্কারের ধারাবাহিকতা: গত দেড় বছরে সংসদ ভবন এলাকা কেবল আইন প্রণয়নের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের তীর্থস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন, নির্বাচন সংস্কার কমিশন এবং জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এখানেই সম্পন্ন হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই শপথের জন্য এই স্থানটি নির্বাচন করা হয়েছে।

৩. জুলাই চার্টার ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাজনৈতিক ঐকমত্য বা ‘জুলাই চার্টার’ তৈরি হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে এই শপথের মাধ্যমে। দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নেওয়ার মাধ্যমে সরকার মূলত সেই বিপ্লবের শহীদদের এবং সাধারণ জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা জাহির করতে চাইছে।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ গেজেট ও ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে (গেজেট স্থগিত থাকা দুটি আসনসহ সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে)। তাদের শরিকরা পেয়েছে আরও ৩টি আসন। অন্যদিকে, ৬৮টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর একটি পাঁচতারা হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারম্যান এবং ভাবী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের এই ঐতিহাসিক বিজয়ে জনগণকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, নতুন সরকার কেবল একটি দলের নয়, বরং এটি হবে জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন।

আগামীকাল মঙ্গলবার এই বিশাল আয়োজন ঘিরে শেরেবাংলা নগর এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) ইতোমধ্যে সংসদ ভবন এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আবদুর রশীদ জানিয়েছেন, নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই দক্ষিণ প্লাজায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে এই শপথ সম্পন্ন হবে।’

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেড় বছরের অস্থিরতা আর সংস্কারের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাংলাদেশ অবশেষে একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে স্থিতিশীলতার পথে যাত্রা শুরু করছে। আগামী মঙ্গলবার বিকেলের সেই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান কেবল এক সেট মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মানুষের হৃত ভোটাধিকার এবং নাগরিক মর্যাদার পুনর্জন্মের ক্ষণ। দক্ষিণ প্লাজার খোলা আকাশের নিচে যে নতুন সূর্য উঠবে, তা যেন সারা দেশের মানুষের মনে সমৃদ্ধি ও ইনসাফের আলো ছড়ায়—এটাই এখন ১৬ কোটি মানুষের প্রার্থনা।